এক থেকে দুই: cell cycle, DNA replication, ও ক্যান্সারের intriguing story

·

·

এই মুহূর্তে আপনি যখন DNA সিরিজের দ্বিতীয় লেখাটা ক্লিক করে পড়ার জন্য ওপেন করলেন, আপনার শরীর থেকে প্রায় ৫০-৬০ হাজার কোষ ঝরে পড়ল। টের পেলেন? উঁহু।

চাইলে প্রথম লেখাটা পড়ে আসতে পারেন। এসময়েও কোষ ঝরতেই থাকবে, আপনার সচেতন অনুভূতি ছাড়াই।

এত কোষ যে একবারে ঝরে গেল,নিশ্চয়ই দেহে কোষ আবার নতুন করে তৈরি হবে এবং এমনভাবে হবে যাতে তাদের অভাব অনুভূত না হয়। মানবদেহের বেঁচে থাকার স্বার্থেই তাকে নতুন কোষ তৈরি করতে হবে। এবং প্রত্যেকটা কোষই হবে পরিণত, তাদের নিউক্লিয়াস ও সাইটোপ্লাজম ঠিকঠাক এবং তারা তাদের কাজ ঠিকমত করবে। 

অর্থাৎ, আমাদের কোষের জীবনেও আমাদের জীবনের মতো পর্যায় আছে (cell cycle)। সে তৈরি হয়, নিজের কাজ করে এবং বিভাজিত হয়। এ লেখায় কোষ বলতে বিভাজনক্ষম কোষকেই বোঝানো হবে।

গত লেখায় আমরা জেনেছিলাম যে, মানুষের একটা কোষের DNA সোজা করলে প্রায় ২ মিটার লম্বা হয়, এবং তাতেই নিউক্লিওটাইডের ভাষায় কোষের সব তথ্য সংরক্ষিত থাকে । এখন,পুরোপুরি কাজ করতে গেলে, প্রতিটি নতুন কোষকে এই ব্লুপ্রিন্টের একটা সম্পূর্ণ copy পেতে হবে। কিন্তু সেই copy কখন তৈরি হয় আর কীভাবে হয়? তাকে কেউ নিয়ন্ত্রণ করে নাকি এমনিই চলতে থাকে? এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে গেলে কোষের জীবনচক্রের দিকে আলোকপাত করা যাক।

Cell cycle কি তাহলে?

কোষের জীবনচক্র বা cell cycle, আসলেই দুটি পর্যায়ের আবর্তন ব্যতীত কিছু নয়। পর্যায় দুটি হলো ইন্টারফেজ আর মাইটোসিস। কোষের কাজ হলো বিভাজন তথা মাইটোসিস। আর এর জন্য যত প্রস্তুতি, তার সবই ইন্টারফেজ। ইন্টারফেজ এতই গুরুত্বপূর্ণ যে, cell cycle এর জন্য যদি ২৪ ঘণ্টা বরাদ্দ দেওয়া হয়, তার মধ্যে ২৩ ঘণ্টাই ইন্টারফেজে লাগবে।

ইন্টারফেজের ভেতরে তিনটি পর্যায় রয়েছে – G1, S এবং G2 পর্যায়। তিনটি পর্যায়, কিন্তু কাজ তিন ধরনের। এবারে সেগুলো একটু দেখে নেওয়া যাক।

G1 পর্যায়ঃ বিভাজনের জন্য যা যা লাগে

এই পর্যায় বা দশাটা হলো কোষের জন্য অনেকটা “দেখে-শুনে পা ফেলার” দশা। এতটাই দেখে শুনে চলতে হয় যে এই পর্যায়ের সময়কালে সবচেয়ে বেশি তারতম্য হয়। এই পর্যায়টাই cell cycle তথা ইন্টারফেজের মধ্যে দীর্ঘতম।

এখানে কোষকে বিভাজনের জন্য প্রস্তুতি শুরু করতে হয়। একটা কোষ থেকে দুইটি কোষ তৈরির সময় যেন সাইটোপ্লাজমের ঘাটতি না হয় সেজন্য সব কিছু বেশি বেশি তৈরি হয়। প্রোটিন, কার্বোহাইড্রেট, লিপিড  এগুলোর সংশ্লেষণ বেড়ে যায়। কোষের অঙ্গাণু (যেমন মাইটোকন্ড্রিয়া, রাইবোজোম) তৈরির পরিমাণও বাড়ে। কোষের ভেতরে এত উপাদান জমা হয় যে তার আকার প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যায়।

ঠিক যেমন কেউ ছোট দোকান থেকে বড় শোরুমে স্থানান্তরিত হতে চাইলে জায়গা বাড়ায়,পণ্য, কর্মচারী সবের সংখ্যা বৃদ্ধি করে, কোষও ঠিক এভাবেই আগায়। এই কাজগুলো বিভাজনের জন্য আবশ্যক। নয়তো দেখা যেত যে, প্রত্যেকবার বিভাজিত হবার পর কোষের আকার কমতে কমতে কোষ একেবারে ছোট হয়ে গিয়েছে। 

এখানে আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় চলে আসে। মাইটোসিসের জন্য বেশিরভাগ প্রস্তুতি কোষ G1 পর্যায়েই নেয়। ঠিকমতো কোষের বৃদ্ধি হচ্ছে কিনা এটাও G1 পর্যায়ে মনিটর করা হয়। কারা করে? ১৯৮০ এর দশকে বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেন যে, কিছু কন্ট্রোল সিস্টেম বা চেকপয়েন্টের মাধ্যমে Cell cycle এর প্রতিটি পর্যায়ে কোষের গুণগত মান পরীক্ষা করে দেখা হয়। পাশ করলে কোষ পরের পর্যায়ে যেতে পারে। অন্যথায়, তাকে আটকে থাকতে হয় G1 পর্যায়ে। কন্ট্রোল সিস্টেমের মতো গালভরা নাম দেওয়া হলেও আদতে এগুলো একগুচ্ছ প্রোটিন।  

কন্ট্রোল সিস্টেমে অনেকগুলো বাইনারি সুইচ রয়েছে, অনেকটা আমাদের বাসাবাড়ির সুইচের মতো। একটা সুইচ Activated হলে পুরো প্রক্রিয়াটাই ঘটবে, আধাআধি ঘটার কোনো সম্ভাবনা নেই। ধরা যাক, G1 পর্যায়ে টার্গেট সেট করা যে কোষে ৪টা মাইটোকন্ড্রিয়া তৈরি হতে হবে। এরজন্য একটা সুইচ অন করা হলো। যতক্ষণ পর্যন্ত ৪টা মাইটোকন্ড্রিয়ার ৪টাই তৈরি না হবে, ততক্ষণ সুইচ ‘অফ’ হবে না। আবার মাইটোকন্ড্রিয়া তৈরির দরকারি রসদ নেই, সুইচ ‘অন’ ই হবে না সেক্ষেত্রে। আরেকটু বড় স্কেলে বলতে গেলে, কোষ ঠিকঠাক কাজ করছে কিনা সেটা দেখার জন্য কিছু চেকপয়েন্ট আছে। 

Cell Cycle এ G1 পর্যায়ের শেষে যে দুটি চেকপয়েন্ট আছে তাদের নাম যথাক্রমে restriction checkpoint এবং G1 DNA damage checkpoint। এদের কাজ দুটো প্রশ্নের উত্তর খোঁজা। এক, কোষ কি শারীরিকভাবে প্রস্তুত? size,organelle, protein — সব ঠিক আছে? দুই,  DNA কি সুস্থ? কোনো অস্বাভাবিকতা নেই তো? প্রশ্ন দুটির উত্তর হ্যাঁ হলেই কোষ Cell Cycle এর পরের পর্যায়ে যাওয়ার অনুমতি পায়।

জানতেন কি ? আমাদের দেহে এমন কিছু কোষ আছে যা কখনোই বিভাজিত হয় না, যেমন নিউরন। তাহলে cell cycle এ তাদের জায়গাটা কই? তারা আসলে সারাজীবনই G1 পর্যায়ে থেকে যায়। কেউ কেউ এটাকে G0 পর্যায়ও বলে থাকেন। আপনি জন্মের সময় যে নিউরন নিয়ে এসেছিলেন, সেটাই আপনার সাথে থাকবে সারাজীবন।

G1 চেকপয়েন্ট পার হলে এরপর রয়েছে একটা কঠিন পর্যায়। Cell কে কপি করতে হবে বিলিয়ন বিলিয়ন নিউক্লিওটাইড,কিন্তু একটাও ভুল হওয়া চলবে না।

Illustration of the cell cycle stages including G1, S, G2, mitosis, and cytokinesis.
cell cycle এর পর্যায়গুলো

S পর্যায়: সবচেয়ে নিখুঁত অনুলিপন

ধরুন আপনি একটা লেখা ডিজিটাইজ করবেন বা কাউকে দিয়ে আবার লেখাবেন। সেটা কি আপনি শেষে একবার চেক করবেন না? অবশ্যই। একদম অক্ষর টু অক্ষর কপি করতে বা টাইপ করতেও ভুল হতে পারে। কিন্তু S পর্যায়ে যে জিনিস কপির কাজ চলে, তার খোঁজ আপনার আমার না রাখলেও চলে। এ পর্যায়েই কোষের প্রস্তুতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধাপ পূরণ হয় : সেটা হলো DNA এর প্রতিলিপি তৈরি। 

S পর্যায়ে মোটামুটি ৭.৫ থেকে ১০ ঘণ্টা সময় লাগে। G1 চেকপয়েন্ট পার হবার পরই Cdk নামের বিশেষ প্রোটিন কোষের জন্য এ পর্যায়ের দরজা খুলে দেয়। এ পর্যায়ের শেষেও আছে চেকপয়েন্ট, যার কাজ হলো DNA কপি করেছে এমন কোষকে পরবর্তী পর্যায়ের জন্য ক্লিয়ারেন্স দেওয়া। তবে খেয়াল করতে হবে নতুন DNA তৈরির কাজটি সম্পূর্ণ হয়েছে কিনা, এবং সেই DNA এর বেসপেয়ার গুলো নির্ভুলভাবে বসানো হয়েছে কিনা। এসব প্রশ্নের সন্তোষজনক জবাব পেলে তবেই কোষ প্রবেশ করতে পারে প্রস্তুতির শেষ পর্যায়ে।

G2 পর্যায় : শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি 

S পর্যায়ে DNA তৈরির মহাযজ্ঞ শেষে কোষের সামনে থাকে আরেকটি কাজ- মাইটোসিসের জন্য চূড়ান্ত প্রস্তুতি নেওয়া। মাইটোসিস কোষ বিভাজনের সময় যে স্পিন্ডল যন্ত্র লাগবে তার তন্তু তৈরি করা, সেন্ট্রোজোমের সংখ্যা বাড়ানো এবং একই সাথে কোষের আকার বৃদ্ধি, এসব করেই কেটে যায় G2 পর্যায়। এ পর্যায়ের শেষেও আছে একটা ফাইনাল চেকপয়েন্ট (G2/M), যা কিনা কোষকে সব কিছু ঠিক থাকা সাপেক্ষে মাইটোসিস এ প্রবেশের অনুমতি দেয়।

আমরা প্রতিটি পর্যায়ের আগে-পরে চেকপয়েন্টের কথা বলছি। চেকপয়েন্টগুলো কেন গুরুত্বপূর্ণ? সেটাই এখন বলব।

যখন বিগড়ে যায় cell cycle এর চেকপয়েন্ট

যেকোনো প্রক্রিয়াকে যদি মনিটর না করা হয়, তাহলে তার ফলাফলের গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। কোষচক্রের ইন্টারফেজ পর্যায়ও তেমনি। এক ধাপ থেকে আরেক ধাপে আসার পথে পরীক্ষা করে দেখা হয় যে কোষ আসলেই এই পর্যায়ে আসার উপযুক্ত কিনা। কন্ট্রোল বিগড়ে গেলে  দেহটাই কীভাবে বিগড়ে যাবে তার একটা উদাহরণ দিই।

একটু আগে S পর্যায়ের একটি গেটকিপার প্রোটিন Cdk কথা বলা হলো । Cdk এর উপর p53 জিনের প্রভাব আছে। কোনো কোষ যদি ত্রুটিপূর্ণ DNA নিয়ে G1 পর্যায়ে আসে, তাহলে p53 তাকে শনাক্ত করে ফেলে। এরপর চলে DNA মেরামত বা রিপেয়ারের চেষ্টা। সফল হলে কোষ পরবর্তী পর্যায়ে যাবে। আর না হলে কোষ নিয়ন্ত্রিত পন্থায় নিজেই নিজের মৃত্যু ডেকে আনবে (Apoptosis) । কোনো কারণে যদি p53 নিজেই যদি অকার্যকর হয়ে যায়, তাহলে সে cdk প্রোটিনকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। তখন অবাধে ত্রুটিপূর্ণ DNA কোষচক্র চালিয়ে যায়। অনিয়ন্ত্রিত মাইটোসিসের কারণে সৃষ্টি হয় ক্যান্সার। অর্থাৎ, ক্যান্সার আসলে কিছুই না, বরং চেকপয়েন্টের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে যাবার গল্প।

Cell cycle checkpoint failure leading to cancer development and tumor spread.
অনিয়ন্ত্রিত cell cycle যখন ক্যান্সারের মূলে

কোষচক্র যখন নিয়মতান্ত্রিক পথে ইন্টারফেজের সব পর্যায় অতিক্রম করে আসে, তখন সে মাইটোসিস বিভাজনে অংশ নেয়। সেটার খুব সংক্ষিপ্ত আলোচনা এখানে করা হলো।

মাইটোসিস: 

এ পদ্ধতিতে কোষ বিভাজনের মাধ্যমে একটি কোষ থেকে দুইটি অপত্য কোষ তৈরি হয়। মাইটোসিস বিভাজনে আগে  নিউক্লিয়াস (karyokinesis) এবং তারপরে সাইটোপ্লাজম (cytokinesis) বিভাজিত হয়। নিউক্লিয়াসের বিভাজন বা ক্যারিওকাইনেসিসই প্রধান। এরপর কোষের সাইটোপ্লাজম দুইটি নতুন নিউক্লিয়াসে বণ্টিত হয়ে দুইটি নতুন কোষ তৈরি করে। প্রতিটি কোষে মাতৃকোষের DNA এর কপি থাকে।

এই কপি করার প্রক্রিয়াটাও নেহাত সহজ নয়, এজন্য লাগবে অনেক প্রোটিন, নিউক্লিওটাইড আর শক্তি। অদ্ভুত অথচ স্বস্তিদায়ক ব্যাপার, এমন একটা সিস্টেমে প্রক্রিয়াটি চলবে যে সিস্টেম নিজেই নিজেকে ঠিক করে চালাতে পারে। কিন্তু তাই বলে একটা কুণ্ডলী পাকানো DNA কে টেনে ধরে তার অনুলিপি বানানো এতই সহজ? তাও আবার আগাগোড়া সবটাই? এর উত্তর পেতে হলে যেতে হবে DNA-র একদম ভেতরে – যেখানে এনজাইমরা অক্লান্তভাবে কাজ করে যাচ্ছে, একটার পর একটা নিউক্লিওটাইড বসাচ্ছে প্রতি সেকেন্ডে ৫০টা করে।

এবং সেখানে একটা সমস্যা আছে। এমন একটা সমস্যা যার সমাধান করতে গিয়ে একজন জাপানি বিজ্ঞানী নিজের জীবন দিয়ে দিয়েছিলেন।

সেই গল্প পরের লেখায়।

১। কোষচক্র (Cell Cycle) কী?

কোষচক্র হলো একটি কোষের সৃষ্টি, বৃদ্ধি এবং বিভাজনের সম্পূর্ণ জীবনচক্র। এটি প্রধানত Interphase ও Mitosis নিয়ে গঠিত।

২। Interphase কী?

Interphase হলো cell cycle এর দীর্ঘতম পর্যায়, যেখানে কোষ বৃদ্ধি পায়, DNA replication হয় এবং বিভাজনের জন্য প্রস্তুতি নেয়।

৩। G1, S এবং G2 পর্যায়ের কাজ কী?

G1 পর্যায়: কোষের বৃদ্ধি ও প্রয়োজনীয় অঙ্গাণু তৈরি, পুষ্টি উপাদান সঞ্চয়।
S পর্যায়: DNA এর সম্পূর্ণ প্রতিলিপি তৈরি।
G2 পর্যায়: মাইটোসিসের জন্য চূড়ান্ত প্রস্তুতি।

৪। DNA Replication কখন ঘটে?

DNA replication Interphase এর S (Synthesis) পর্যায়ে ঘটে।

৫। Cell Cycle Checkpoint কী?

Checkpoint হলো কোষের মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, যা DNA এর ত্রুটি, কোষের আকার ও বিভাজনের প্রস্তুতি পরীক্ষা করে।

৬। p53 জিনের কাজ কী?

p53 জিন ক্ষতিগ্রস্ত DNA শনাক্ত করে এবং DNA মেরামত বা প্রয়োজন হলে কোষকে apoptosis এর মাধ্যমে ধ্বংস করতে সাহায্য করে।

৭। Cell Cycle এর ত্রুটি কীভাবে ক্যান্সার সৃষ্টি করে?

Checkpoint সঠিকভাবে কাজ না করলে ত্রুটিপূর্ণ DNA সহ কোষ অনিয়ন্ত্রিতভাবে বিভাজিত হতে থাকে, যা ক্যান্সারের কারণ হতে পারে।

৮। সব কোষ কি Cell Cycle এর মধ্য দিয়ে যায়?

না। কিছু কোষ, যেমন নিউরন, সাধারণত বিভাজিত হয় না এবং G0 বা স্থায়ী বিশ্রাম অবস্থায় থাকে।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: