পূর্বকথাঃ
১৯৬৮ সাল। জাপান।
রেইজি ওকাজাকি রাত ১১টায় তাঁর ল্যাবে বসে আছেন। তেজস্ক্রিয় নিউক্লিওটাইড দিয়ে DNA এর উপর পরীক্ষা চালাচ্ছেন। চোখে ক্লান্তি, কিন্তু হাত থামছে না।
হিরোশিমার স্মৃতি বয়ে বেড়ানো বিজ্ঞানী এমন কিছুর পেছনে ছুটছেন যেটা কেউ এখনো দেখেনি। DNA কপি হওয়ার সময় একটা জায়গায় কী হয়, সেই রহস্য।
সেই রহস্যের উত্তর খুঁজতে গিয়ে তিনি যা পেলেন, তা আজ প্রতিটি Biology বইয়ে তাঁর নাম খোদাই করে দিয়েছে। আমরাও সেই বিস্ময়কর ব্যাপার নিয়েই আজ খানিক আলাপ করব।
একনজরে আলোচনাঃ
গত লেখায় বলেছিলাম যে, Cell Cycle এর S পর্যায়ে DNA এর কপি তৈরি হয়। কয়েক ঘণ্টায় ৩২০ কোটি বেসপেয়ার সুদ্ধ একটা আস্ত DNA বেরিয়ে আসে, ঠিক অরিজিনাল DNA টার মতোই। কিন্তু এটা কোন মেশিনের কাজ যে জানে কোথায় কাজ শুরু করতে হবে? এবং DNA এর দুইটি সূত্র যখন দুইদিকে, কীভাবে একইসাথে কপির কাজ চলতে থাকে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর বুঝতে হলে একটু ভেতরে যেতে হবে।
DNA Replication কী?
আগে হয়তো বলেছি, এখন ভালোমতো বলি যে, DNA কপি করার প্রক্রিয়াকে কেতাবি ভাষায় DNA replication বলে। আমরাও এখন একে এই নামেই ডাকব।
DNA replication এ মূলত যা হয় তা হলো, একটা DNA থেকে দুইটা DNA বেরিয়ে আসে। এক্ষেত্রে DNA এর দুইটি পলিনিউক্লিওটাইড চেইন প্রথমেই আলাদা হয়ে যায় এবং একেকজন টেমপ্লেট বা ছাঁচ হিসেবে কাজ করে। এরপর প্রত্যেকটা চেইন নিজেদের নিউক্লিওটাইডের ভিত্তিতে যার যার কপি বানিয়ে নেয়। শেষে ছাঁচ আর নতুন সূত্র প্যাঁচ লেগে গেলেই DNA replication শেষ।
বিষয়টি বুঝতে কষ্ট হলে একটি রেললাইনের কথা ভাবতে পারেন। রেললাইনের মধ্যকার কাঠের তক্তাকে ভেঙে দুইদিকে লাইন আলাদা করে দিলেন। এখন ভাঙা লাইনগুলোর মাপে যদি আপনি নতুন লাইন তৈরি করে দেন, তাহলে কি একটা লাইন থেকে দুটো হলো না? ব্যস, একইভাবে একটা DNA থেকে দুইটি DNA তৈরি হচ্ছে। এটি অনেক নির্ভুল এবং দ্রুত, কিন্তু নিতান্ত সরল নয়। একেকটা কাজের জন্য লাগবে একেকজন এনজাইমকে। এনজাইমগুলোও কাজ করবে দলবেঁধে (replication complex)। Construction ও Repair দুটোই চলবে সমান গতিতে।
কীভাবে, এবার সেদিকে আলোকপাত প্রয়োজনীয় মনে করছি।
শুরুটা হয় কোথা থেকে?
ধাপ ১: DNA এর প্যাঁচ খোলা
প্রথম লেখাতেই বলেছি, DNA এর গঠন প্যাঁচানো সিঁড়ির মতো। Replication প্রক্রিয়ার জন্য আগে এই দুটো সূত্র আলাদা করতে হবে। কিন্তু পুরোটা একসাথে খোলা সম্ভব না। এজন্য বিভিন্ন জায়গা থেকে একযোগে শুরু হবে কাজ। যেটুক জায়গার প্যাঁচ খোলা হবে, সেখান থেকেই DNA replication শুরু হবে। সেই জায়গাটুকুর নাম ORI বা Origin of Replication।
মানুষের DNA তে এরকম Origin আছে হাজার হাজার – মানে এসব জায়গা থেকে একযোগে DNA replication শুরু হয়। এই parallel processing-এর কারণেই কাজটা কয়েক ঘণ্টায় শেষ হয়। একটা Origin থেকে শুরু হলে কতক্ষণ লাগত? কয়েক সপ্তাহ তো বটেই!
প্যাঁচ খোলা এবং replication এর পুরোটা সময় তা ধরে রাখা, এরজন্য দুইজন এনজাইম এবং একজাতের প্রোটিন কাজ করে । তাদের নাম যথাক্রমে helicase, topoisomerase এবং single strand binding protein।
- Helicase : সূত্র দুটির মাঝখানের হাইড্রোজেন বন্ধন ভেঙে ফেলে। জামার চেইন টান দিলে যেমন খুলে যায়, helicase এর কাজের দরুন ঠিক সেভাবেই পলিনিউক্লিওটাইড চেইন পরস্পর আলাদা হয়ে যায়। যেটুকু অংশ খুলে যায় তাকে replication fork বলে।
- Topoisomerase : প্যাঁচানো দুইটি চেইন আলাদা করার কারণে সামনের দিকে সূত্রের অংশ আরো জড়িয়ে যায়। কুণ্ডলী পাকানো রোধ করতে তখন একটা বা দুইটা সুত্রের সামান্য একটু অংশ সাময়িকভাবে কেটে দিলেই টানটা আর থাকে না। এই কাটার কাজটাই Topoisomerase এর। Helicase এর কাজের জন্য পথ আরো সুগম হলো।
- SSBP (Single Strand Binding Protein): নতুন সূত্র দুটি আবারও নিজেদের মধ্যে হাইড্রোজেন বন্ধন তৈরি করতে পারে। সেজন্য SSBP নামের প্রোটিনগুলো সূত্রদের সাথে বন্ধন তৈরি করে। সূত্রদুটি তখন আর নিজেরা পেঁচিয়ে যেতে পারে না। অনেকটা দুই পাশ থেকে দুজন ধরে রাখলে যেমন কেউ মাঝে ঢুকতে পারে না – SSBP সেই কাজটাই করে।
ধাপ ২: প্রাইমার লাগবে!
মাতৃ সূত্র থেকে নতুন সূত্র তৈরি করার জন্য একটা বেজের মতো জিনিস লাগবে, যেখান থেকে DNA polymerase (সূত্র তৈরির মূল কারিগর) এনজাইম তার কাজ শুরু করতে পারবে। এই বেজ বা ভিত্তিটাই হলো প্রাইমার। প্রাইমারে কয়েকটি রাইবোনিউক্লিওটাইড থাকে। প্রাইমার তৈরির জন্য লাগবে primase এনজাইমকে।
নতুন সূত্রঃ একদিকে সহজ, অন্যদিকে জটিল
ধাপ ৩: নতুন নতুন সূত্রের আবির্ভাব
এ পর্যায় থেকে শুরু হবে নতুন সূত্র তৈরি। এখানে যিনি কাজ করবেন, তার নাম DNA Polymerase তা ইতোমধ্যে বলা হয়েছে। Primer এর পর থেকে সে কাজ শুরু করে। মাতৃসূত্রের সাথে মিলিয়ে মিলিয়ে নিউক্লিওটাইড বসানো শুরু করে। এখানেই দেখা দেয় এক সমস্যা।
DNA Polymerase শুধু একদিকে কাজ করতে পারে – 5′ থেকে 3′ দিকে। উলটো দিকে কাজ করতে পারে না । এটা তার গঠনগত সীমাবদ্ধতা। অর্থাৎ যে মাতৃসূত্র 3’⇨5′, শুধু তার সম্পূরক সূত্র তৈরি হওয়ার কথা। এই সূত্রে DNA polymerase স্বাভাবিকভাবে এগিয়ে যেতে পারে, তাই এই সূত্র বা strand এর নাম Leading Strand। এটি নিরবচ্ছিন্নভাবে তৈরি হচ্ছে।
তাহলে 5’ ⇨3’ মাতৃসূত্রের কী হবে যেহেতু replication fork সূত্রের উল্টোদিকে যাচ্ছে? এই প্রশ্নটা ১৯৬০-এর দশকে অনেক বিজ্ঞানীকে ভাবাচ্ছিল। Reiji Okazaki সেই প্রশ্নটাকে নিয়ে সবচেয়ে গভীরে কাজ করতে লাগলেন।
ধাপ ৪: Okazaki fragments
যেহেতু DNA replication এর সময় DNA polymerase ই মূল কাজ করে,তাই বিজ্ঞানীরা ধরে নিয়েছিলেন যে দুটো সূত্র হয়তো নিরবচ্ছিন্ন ভাবেই তৈরি হচ্ছে। কিন্তু DNA polymerase এর গঠন তো তা বলছে না। তখন বিজ্ঞানী Reiji Okazaki এবং Tsuneko Okazaki হাইপোথিসিস দাঁড় করালেন যে, নতুন সূত্রগুলোর মধ্যে একটা নিরবচ্ছিন্নভাবে এবং অপরটি খণ্ড খণ্ড ভাবে তৈরি হচ্ছে। কিন্তু একে প্রতিষ্ঠিত করতে হলে চাই প্রমাণ। এর জন্য উনারা দুটো এক্সপেরিমেন্ট করেন।
ওকাজাকিরা এই পরীক্ষাগুলো করেন Escherichia Coli ব্যাকটেরিয়ার DNA এর উপর। প্রথমে তাঁরা কোষে প্রচুর radioactive থাইমিডিন নিউক্লিওটাইড দেন। উদ্দেশ্য, এগুলো DNA replication এ যখন ব্যবহৃত হবে তখন তেজস্ক্রিয় রশ্মির সাহায্যে এদের শনাক্ত করা যাবে। এরপর খুবই অল্প সময়ের (pulse) জন্য ব্যাকটেরিয়ার DNA replication করানো হয়। তারপর প্রক্রিয়াটা বন্ধ করে নতুন DNA বের করে এনে তা পরীক্ষা করা হলো। দেখা গেল যে, DNA এর অনেক ছোট ছোট খণ্ড পাওয়া গেছে যা মাত্রই replication এর মাধ্যমে তৈরি হয়েছে।
এরপর তাঁরা দ্বিতীয় এক্সপেরিমেন্টটা করেন। সেখানে প্রথমে অল্প সময়ের জন্য Radioactive thymidine দেওয়া হলো (Thymidine pulse), এরপর দেওয়া হলো প্রচুর Non-radioactive thymidine। এখানেও প্রথমে খণ্ড খণ্ড radioactive DNA পাওয়া গেল। একটু পর দেখা গেল খণ্ডগুলো গায়েব, বরং এখন একটা বড় DNA সূত্র থেকে radioactivity পাওয়া যাচ্ছে! মানে খণ্ডগুলো জোড়া লেগে আস্ত সূত্র তৈরি করে ফেলেছে।
সেই খণ্ডগুলোর নামই Okazaki fragments বা বাংলায়, ওকাজাকি খণ্ড।
১৯৭৫ সালে Reiji Okazaki মারা যান লিউকেমিয়ায়। কিন্তু গবেষণা থামেনি। তাঁর স্ত্রী Tsuneko Okazaki একাই কাজ চালিয়ে যান এবং সেই খণ্ডগুলোর পরিচয় পৃথিবীর সামনে প্রতিষ্ঠিত করেন।

ধাপ ৫: পলিশিং
ওকাজাকি খণ্ড গুলো সুত্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করার আগে এদেরকে জোড়া দেয় Ligase এনজাইম। তারপরেও বাকি থেকে যায় আরেকটু কাজ – প্রাইমার অপসারণ। এত এত ডিঅক্সিরাইবোনিউক্লিওটাইডের মাঝখানে কয়েকখানা রাইবোনিউক্লিওটাইড বেমানান বৈকি! সেটার কাজিও DNA Polymerase এনজাইম। এরপর প্রাইমার সরানোর কারণে সূত্রে যেটুকু ফাঁক তৈরি হয় সেটা বন্ধ করে দেয় ligase। এই জোড়া দেওয়ার ক্ষমতার কারণে বিজ্ঞানীরা একে “molecular glue” নামেও ডেকে থাকেন।
কেউ কি খেয়াল করেছেন, আগের লেখাগুলোতে যখনই DNA replication এর প্রসঙ্গ টানা হয়েছে, তখনই তার নির্ভুলতার উপরও বেশ জোর দেওয়া হয়েছে? সে বিষয়ে এখনই কথা বলার সময়।
Last but not least: Proofreading and Repair
টেমপ্লেটের চাহিদা অনুযায়ী সঠিক নাইট্রোজেনাস বেস আনতে অনেক সময় ভুল হতে পারে। যেমন আছে A, সাথে লাগবে T। DNA polymerase ধরে আনলো আরেকটা A কে। আটকে দিলো হাইড্রোজেন বন্ড দিয়ে। এটাই হলো mismatch, অর্থাৎ একজনের জায়গায় অন্যজনকে বসিয়ে দেওয়া। এটাও ঠিক করার কাজ DNA polymerase এর। প্রত্যেক DNA polymerase যার যার সূত্র তৈরির সময় বেসপেয়ার ঠিকঠাক বসছে কিনা সেটাও খেয়াল করতে থাকে। অনেকটা ধরে নিন তার সামনে ও পেছনে দুইটি চোখ। সামনের চোখ দিয়ে সে নতুন কোন বেস লাগবে তা ডিটেক্ট করে। আর যতটুকু সূত্র সে তৈরি করে এসেছে তা স্ক্রিনিং করে পেছনের চোখ।
যদি ভুল নিউক্লিওটাইড বসে যায়, তাহলে DNA polymerase এর কাজ হলো ওটাকে সরিয়ে ঠিকটাকে তার জায়গায় বসানো।

একারণেই DNA replication এ ভুলের হার অনেক অনেক কম, ১০০০ কোটিতে মাত্র একবার।
একটা প্রশ্ন থেকেই যায়:
DNA replication শেষ। দুটো নতুন DNA পাওয়া গেল।
একটা জায়গায় একটু ফাঁক আছে।
DNA এর lagging strand এর একদম মাথায় DNA Polymerase পৌঁছাতে পারে না। তাই তাকে একটু দূরে নতুন প্রাইমার বসাতে হয়। মাঝের জায়গাটুকুতে নতুন নিউক্লিওটাইড যুক্ত হতে পারে না। অর্থাৎ প্রতিবার DNA replication এর পর এই ছোট জায়গাগুলো লস হচ্ছে।
এই সমস্যাকে বলে End Replication Error।
মানে দাঁড়ালো যে, প্রতিটা কোষ বিভাজনে আমাদের সবার DNA একটু করে ছোট হচ্ছে। ধীরে ধীরে। অনেকটা মোমবাতির মতো – জ্বলতে জ্বলতে ছোট হয়।
তাহলে কি DNA নাই হয়ে যাবে? এর প্রতিকারে কোষের কী করার আছে?
DNA এর শেষে একটা বিশেষ protective cap আছে। এটার নাম টেলোমিয়ার (Telomere)। এ কিছুটা সাহায্য করে।
আবার আমাদের বার্ধক্যের পেছনেও একটা বড় হাত আছে Telomere এর।
কী কেন কীভাবে- এসবের উত্তর পরের লেখায়।
১। DNA replication কী?
DNA রেপ্লিকেশন হলো সেই প্রক্রিয়া যেখানে একটি মাতৃ DNA অণু থেকে দুইটি অপত্য DNA তৈরি হয়।
২। DNA replication কোথায় হয়?
Eukaryote কোষে DNA রেপ্লিকেশন ঘটে নিউক্লিয়াসের ভেতরে, S Phase (Synthesis Phase) এ।
৩। Okazaki Fragment কী?
Lagging strand এ নতুন DNA সূত্র ছোট ছোট টুকরোয় তৈরি হয়। এই টুকরোগুলোকেই Okazaki Fragment বলে।
৪। DNA Polymerase কি সরাসরি কাজ শুরু করতে পারে?
না। DNA Polymerase একা শুরু করতে পারে না ।তার আগে Primase এসে একটি ছোট RNA Primer তৈরি করে দেয়।
৫। DNA রেপ্লিকেশনে ভুল হলে কী হয়?
সাধারণত হয় না , DNA Polymerase নিজেই proofreading করে ভুল সংশোধন করে নেয়।
৬। DNA replication কে অর্ধ-সংরক্ষণশীল পদ্ধতি বলা হয় কেন?
প্রতিটি নতুন DNA অণুতে একটি strand পুরনো (parent) এবং একটি strand নতুন থাকে। পুরো DNA টা নতুন হয় না, বরং অর্ধেক পুরনো থাকে। তাই এটিকে semi-conservative বা অর্ধ-সংরক্ষণশীল পদ্ধতি বলা হয়।
Leave a Reply